প্রাণিজাত সামগ্রী (Livestock products) :
বাংলাদেশে ১৯৯৫-৯৬ সালে উৎপাদিত দুধের পরিমাণ ছিল ১৫.৮ লক্ষ মে টন, ১৯৯৬-৯৭ সালে ১৫.০৯ লক্ষ মে টন এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে ১৬.২ লক্ষ মে টন। মাংস উৎপাদনের পরিমাণ ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল ৫.৪ লক্ষ মে টন, ১৯৯৬-৯৭ সালে ৫.৮ লক্ষ মে টন এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে ৬.২ লক্ষ মে টন। আরেক হিসাবে দেখা যায় ঐ সময়ে অর্থাৎ ১৯৯৫-৯৬ সালে ডিম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮৩ কোটি ৯ লক্ষ, ১৯৯৬-৯৭ সালে ৩০২ কোটি এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে ৩২৫ কোটি ২০ লক্ষ। ২০০৬-০৭ সালে দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ২২.৮ মিলিয়ন মে টন, ১.০৪ মিলিয়ন মে টন ও ৫৩৬৯ মিলিয়ন ।
এদেশে গবাদি প্রাণির বৃদ্ধির হার সামান্য, ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত মাত্র ০.২৫%। কম জন্মহার, রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচুর সংখ্যক গবাদি প্রাণি কোরবানি এবং অপরিকল্পিত প্রাণি জবাই গবাদি প্রাণির বৃদ্ধি হার দমিত থাকার প্রধান কারণ।
গরু ও মহিষ লাঙল ও গাড়ি টানায়, রাস্তাঘাটে ও খামারে পরিবহণের কাজে, ধান ও আখ মাড়াই কাজে এবং তৈলবীজ থেকে তেল উৎপাদনে চালিকা শক্তির যোগান দেয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় প্রাণিশক্তির পরিমাণ যথেষ্ট কম। বংশানুগতভাবে নিম্নমানের হওয়ার কারণে বাংলাদেশের গবাদি প্রাণি ও হাঁস-মুরগি থেকে প্রাপ্ত দুধ, মাংস ও ডিমের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। একটি স্থানীয় গাভী বছরে গড়ে প্রায় ২২১ কেজি দুধ দেয়। সে তুলনায় ডেনমার্কের এবং যুক্তরাষ্ট্রের গাভীর দুধ উৎপাদন ক্ষমতা যথাক্রমে বছরে প্রায় ৪৯২০ কেজি এবং ৫৩৭৭ কেজি।
একটি স্থানীয় গরুর মাংস উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র প্রায় ৫০ কেজি। দেশজ মুরগিও ডিম দেয় বছরে মাত্র ৪০-৫০টি। এ দিক থেকে বাংলাদেশের স্থানীয় জাতগুলির উৎপাদনশীলতা অন্য উন্নত দেশের তুলনায় যথেষ্ট কম। বিদেশ থেকে আনা মুরগির জাতগুলি এখন ২৫০টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদন করছে। স্থানীয় ছাগলের মাংস উৎপাদন ক্ষমতা ছাগল প্রতি গড়ে প্রায় ১০ কেজি, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গড় উৎপাদনের (১১ কেজি) প্রায় কাছাকাছি। নিম্নের সারণিতে বাংলাদেশে দুধ, মাংস ও ডিমের বাৎসরিক উৎপাদন, চাহিদা ও ঘাটতি সংক্রান্ত একটি হিসাব দেখানো হয়েছে।
সারণির উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, বর্তমানের চাহিদার তুলনায়, বিশেষ করে দুধ ও মাংসের বাৎসরিক উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির হার যথেষ্ট কম। তবে দেশে বর্তমানে হাঁস-মুরগি খাতের সম্প্রসারণ ঘটায় ডিমের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হবে বলে আশা করা যায়।
প্রাণীর ত্বক ও চামড়া মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে প্রাণিজাত এ সম্পদের উৎপাদন সন্তোষজনক। দেশে মোট লভ্য চামড়ার শতকরা প্রায় ৮১ ভাগ ‘wet blue leather’ হিসেবে এবং চামড়াজাত অন্যান্য সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করা হয়। দেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের এবং চামড়ার সামগ্রী তৈরির অনেক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা রয়েছে। কয়েক হাজার লোক এসব কারখানায় কর্মরত আছে। চামড়াজাত ব্যবহার্য পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জুতা, সুটকেস, ব্যাগ, তাবু ইত্যাদি।
গোবর প্রাকৃতিক সার ও জ্বালানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বছরে প্রায় ৮ কোটি মে টন গোবর পাওয়া যায়। গোবর বায়োগ্যাস তৈরিতেও এখন ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়া গবাদি প্রাণির হাড়, শিঙ, খুর ইত্যাদি দ্রব্যও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চূর্ণ ও আংশিক চূর্ণ হাড় ইত্যাদি রপ্তানি করে দেশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে।
প্রাণি-পাখিজাত সামগ্রীর প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাজার ব্যবস্থাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে এ দুটো বিষয়েই প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক। বর্তমানে প্রথমোক্ত বিষয়ে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো এবং শেষোক্ত বিষয়ে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের জন্য হস্তক্ষেপ চলছে। তাতে ভবিষ্যতে কোন এক সময় প্রাণি-পাখিজাত সামগ্রীর সরবরাহ অনেক বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যমূল্য উৎপাদকের স্বার্থের প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। তখন বিপণন ব্যবস্থায় হস্থক্ষেপ ও মূল্য সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে এখনও যেহেতু প্রাণি-পাখিজাত সামগ্রীর চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি অনেক বেশি এবং যেহেতু জনপ্রতি আয় ক্রমেই বাড়ছে সেহেতু অদূর ভবিষ্যতে আভ্যন্তরীণ বাজারে প্রাণি-পাখিজাত সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য পতনের সম্ভাবনা খুবই কম। এ নাগাদ সামগ্রীক মূল্য পরিস্থিতি উৎপাদন বৃদ্ধির অনুকূলে রয়েছে। [শেখ হেফাজউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন