গবাদি প্রাণির ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পরজীবী (Livestock pests and parasites) :

পালিত প্রাণির ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পরজীবীদের মধ্যে আছে আর্থ্রোপোড, কৃমি ও প্রোটোজোয়া, যারা গবাদি প্রাণিকে খাদ্য ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের নিরক্ষীয় জলবায়ু ও অনুন্নত পশুসেবার দরুন এখানে নানা ধরনের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও পরজীবীর অবাধ বিস্তারের অনুকূল বাস্ত্তসংস্থানিক পরিবেশ রয়েছে। বাছাইকৃত এই জাতীয় শতাধিক প্রজাতির মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিই শুধু সংক্ষেপে বর্ণিত হলো।

চিহ্নিত ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিপদী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে এঁটেল, মাইট, উকুন ও কিছু মাছি। এঁটেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য Boophilus microplus, Haemaphysalis bispinosa, Rhipicephalus sanguineus, এবং Hyalomma anatolicum। প্রায় সব জাতের রোমন্থকই এসব এঁটেল দ্বারা সারা বছর কিছুটা আক্রান্ত থাকে। প্রায়শ অল্পবয়সীরা এবং বিদেশী ও সংকর প্রাণীগুলিই অত্যধিক মাত্রায় আক্রান্ত হয়। সব জাতের এঁটেলই ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তবে H. anatolicum প্রজাতিটি দেশের উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক অঞ্চলে (রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায়) সীমাবদ্ধ। বেশির ভাগ গবাদি পশুই নিম্নোক্ত এক বা একাধিক জাতের উকুন দ্বারা আক্রান্ত হয়: Haematopinus tuberculatus, H. eurysternus, Linognathus vituli, L. steropsis, Damalinia bovisএবং D. ovis। শীতকালেই উকুনের অধিক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ঘোড়া ও গাধায় সহজদৃষ্ট D. equi রাজশাহী, টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলায় ব্যাপক।

সাধারণত গ্রীষ্মকালে গরু, ভেড়া ও ছাগলের অন্ডকোষ, কান ও পায়ের যে ক্ষত দেখা দেয় তাতে সম্পৃক্ত Callitroga americana এবং Chrysomyia bezzianaমাছিরা। Oestrus ovis মাছিঘটিত নাকের ক্ষত ছাগলের মধ্যে অত্যধিক (২৫%)। সহজদৃষ্ট মাইটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভেড়া, ছাগল ও গরুর পরজীবী Sarcoptes scabiei ও Psoroptes ovis; এদের আক্রমণ মাঝারি (প্রায় ১০%), সাধারণত শীতকালেই এদের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং সারা দেশে দেখা যায়।

ক্ষুদ্রান্ত্রবাসী Neoascaris vitulorum ঘটিত কৃমিরোগ বাংলাদেশে গরুর বাচ্ছা পালনের একটি বড় অন্তরায়। প্রায় ৭০% বাছুর এই কৃমিতে আক্রান্ত হয়। Parascaris equorum কৃমি ঘোড়ার ক্ষুদ্রান্ত্রে পাওয়া গেছে, তবে আক্রমণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেই। ভেড়া ও ছাগলের চতুর্থ উদরের বাসিন্দা Haemonchus contortus কৃমির আক্রমণ সাধারণত কমবয়সীদের মধ্যেই অত্যধিক (৮৫%)। গরুর বাছুরে H. contortus ও H. simulis কৃমিদের আক্রমণ ২০-২৪%। বাছুরের উদরবাসী Mecistocirrus digitatus আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৃমি, আক্রান্তের হার ৪৪%। অন্ত্রবাসী এইসব কৃমি রক্তচোষকও, এদের অস্তিত্ব সারা বাংলাদেশে।

Trichostrongylus axei, T. colubriformis, Cooperia pectinata, C. punctata, Oesophagostomum radiatum, O. columbianum, Bunostomum bovis, B. phlebotomum, Gaigeria pachyscelis সাধারণ পৌষ্ঠিকনালির গুঁড়াকৃমি; এরা বাংলাদেশের রোমন্থক প্রাণীদের আক্রমণ করে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুটা সীমিত G. pachyscelis ছাড়া বাকি সবগুলিই দেশের সর্বত্র বিদ্যমান।

ঘোড়া ও গাধার সচরাচরদৃষ্ট গুঁড়াকৃমি হলো Habronema megastoma, T. axei, Strongylus vulgaris এবং Oxyuris equi। কুঁজক্ষতের (humpsore) পরজীবী Stephanofilaria assamensis দ্বারা আমাদের গরুর প্রায় ১৫% (প্রধানত ষাঁড়) আক্রান্ত হয়। দেশের সর্বত্র বিস্তৃত এই রোগটি সাধারণত গ্রীষ্মকালেই দেখা যায় আর সেটা মাছির (Musca conducens) প্রজনন মরসুমও। Onchocerca gibsoni, ও O. armillata এই দুটি ফাইলেরিয়ার গুঁড়াকৃমিও প্রধানত প্রাপ্তবয়স্ক ষাঁড়দেরই আক্রমণ করে। গরুর শ্বাসনালীর বাসিন্দা Dictyocaulus viviparous কৃমির আক্রমণ মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও হবিগঞ্জ জেলায় ঘটে। বাছুরের মধ্যে সহজদৃষ্ট Strongyloides papillosus কৃমি সারা দেশেই আছে।

ট্রেমাটোড Fasciola gigantica বাংলাদেশের ৬০% রোমন্থক প্রাণীকে আক্রমণ করে। কৃমিটি সারা দেশে থাকলেও সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য-চট্টগাম, ঢাকা, নেত্রকোণা, বরিশাল, খুলনা ও ফরিদপুর জেলায় এর প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃত অধিক। এই কৃমির মাধ্যমিক পোষক একটি শামুক- Lymnaea auricularia। অন্ত্রের শিরার বাসিন্দা Schistosoma spindalis ও S. indicum ঘটিত গরুর অন্ত্রীয় সিস্টোসোমিয়াসিস (schistosomiasis) রোগটি সারা দেশেই আছে। তিন বছরের বেশি বয়সী গরুতেই আক্রমণ অধিক (প্রায় ২৫%) এবং পূর্ণবয়স্ক ভেড়া ও ছাগলে কিছুটা কম (১২%)। S. nasalis ঘটিত নাকের (সিস্টোসোমিয়াসিস) সারা দেশে গরু ও মহিষে বহুব্যাপ্ত। এই রোগের আক্রমণ ব্যাপক (৬০%) এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সহজদৃষ্ট।

হাইডাটিড সিস্ট প্রায় ১৩% গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার যকৃতে দেখা গেছে। গরুর মধ্যে এগুলির ৫৮% বন্ধ্যা, কিন্তু ভেড়া ও ছাগলে সবগুলিই প্রজননক্ষম। এসব সিস্ট যা Echinococcus granulosus ফিতাকৃমির লার্ভা, গোটা দেশে কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের ক্ষুদ্রান্ত্রে সর্বদাই থাকে। Coenurus cerebralis ঘটিত ‘Gid’ রোগ প্রায়ই ছাগলের মস্তিষ্কে দেখা দেয় এবং দেশের ২-৩% ছাগল এতে আক্রান্ত হয়। পূর্ণবয়স্ক ফিতাকৃমি Taenia multiceps কুকুরে বেশি দেখা যায়। ভেড়ার বাচ্চা ও গরুর বাছুরের মধ্যে সহজদৃষ্ট Moniezia expansa ও M. benedeni প্রজাতির কৃমিতে ওই বয়সী ভেড়া ও বাছুরের প্রায় ২০% আক্রান্ত হয় এবং রোগটি সারা দেশেই আছে। Anoplocephala magna ও A. perfaliata সাধারণ ফিতাকৃমি, দেখা যায় বাংলাদেশের ঘোড়া ও গাধার ক্ষুদ্রান্ত্রে।

প্রোটোজোয়াঘটিত রোগের মধ্যে ১-২ বছর বয়সী বাছুরের কক্সিডিওসিস সর্বাধিক। Eimeria zurnii বা E. bovisজনিত এই রোগে ৫-১০% বাছুর আক্রান্ত হয়। E. intricata, E. parva, E. faurei, E. ninakohlyakimovaeপ্রোটোজোয়া প্রজাতিগুলির সংক্রমণে ভেড়া ও ছাগলের মধ্যেও কক্সিডিওসিস দেখা দেয়, কিন্তু তেমন কোন ক্ষতি ঘটে না। রক্তের প্রোটোজোয়া Bebesia bigemina এবং B. bovis কখনও কখনও বাছুরদের মধ্যে চোখে পড়ে (০.০৩%), B. equi পাওয়া যায় ঘোড়া ও গাধার রক্তে। সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে, প্রধানত বিদেশী সংকর গরুর মধ্যে Theileria একটি প্রজাতি ধরা পড়েছে। দেশের উত্তর-পূর্ব জেলাগুলিতে ঘোড়া, গাধা ও গরুর মধ্যে মাঝে মাঝে Trypanosoma evansi দেখা যায়। রক্তবাহী প্রোটোজোয়া Stomoxys calcitrans ও Tabanusপ্রজাতির রক্তচোষক মাছির উপস্থিতি ও সংখ্যার সঙ্গে জড়িত।  [মোঃ হাফেজুর রহমান]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রাণিসম্পদ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (Livestock education and training) :

প্রাণিসম্পদ (Livestock) :